দরিদ্রের মানিক, মানিকের দারিদ্র্য

ড. মিল্টন বিশ্বাস
‘অহিংসা’ উপন্যাসে গরিবের প্রতি মানিকের মমত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়। এই উপন্যাসে ‘যাত্রা’ দেখার সূত্রে লেখক দেখিয়েছেন যাত্রার আসরে জায়গা থাকা সত্ত্বেও গ্রামের ভদ্রলোকেরা গরিবদের শতরঞ্জিতে বসতে দেয় না। কারণ গরিবরা ‘যাত্রা শুনতে যায় গামছা কাঁধে’ করে। অন্যদিকে ‘শহরবাসের ইতিকথা’য় আমরা দেখতে পাই গ্রামের শ্রীপতি কামার শহরে এসে কারখানায় চাকরি নিয়েছে। কিন্তু তার মন পড়ে আছে গ্রামের বাড়িতে তার স্ত্রীর কাছে। শ্রীপতি শ্রমিকদের একজন হওয়ার পরে শ্রমিকদের দাবি আদায়ের গল্প শোনে। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়। এভাবে মানিকের উপন্যাসে গ্রামের অশিক্ষিত দরিদ্র কামার শহরের শ্রমিক হয়ে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সংগ্রামী হয়ে উঠেছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬) জন্ম শতবার্ষিকীতে (জন্মতারিখ ১৯ মে) তার কথাসাহিত্যে চিত্রিত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আচরণ বিবেচনা করে লেখক হিসেবে তার ব্যক্তি জীবনের দারিদ্র্যের স্বরূপ বিশ্লেষণ করা আমার এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধের লক্ষ্য। মানিকের কথাসাহিত্য তিনটি পর্বে বিভক্ত। সাহিত্যে প্রযুক্ত দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য এক্ষেত্রে তাৎপর্যবহ। এ সম্পর্কে তার নিজের বক্তব্য হচ্ছে Ñ ‘লিখতে আরম্ভ করার পর জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আগেও ঘটেছে, মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর আরো ব্যাপক ও গভীরভাবে সে পরিবর্তন ঘটানোর প্রয়োজন উপলব্ধি করি। আমার লেখায় যে অনেক ভুল; ভ্রান্তি, মিথ্যা আর অসম্পূর্ণতার ফাঁকি আছে আগেও আমি তা জানতাম। কিন্তু মার্কসবাদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগে এতোটা স্পষ্ট ও আন্তরিকভাবে জানার সাধ্য হয়নি।’ (সাহিত্য করার আগে)
প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র থাকার সময় ১৯২৮ সালে ‘অতসীমামী’ নামে মানিকের প্রথম গল্প রচনার সংবাদ পাওয়া যায়। ১৯৩৫-এ ‘অতসীমামী ও অন্যান্য গল্প’ নামে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ১৯২৯ সালে উপন্যাস ‘দিবারাত্রির কাব্য আদি রচনা’ শুরু হয়। ১৯৩৪ সালে এটি বঙ্গশ্রী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ডিসেম্বর ১৯৩৫ সালে। তবে ‘জননী’ একই সালের মার্চে প্রকাশিত হয়। এদিক থেকে ‘জননী’ মানিকের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস। ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ পূর্বাশা (১৯৩৪) এবং ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ ভারতবর্ষ পত্রিকায় (১৯৩৫) ধারাবাহিকভাবে মুদ্রিত হয়। ১৯৩৬ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় এই দুটিসহ ‘জীবনের জটিলতা’ নামে আরো একটি উপন্যাস। ১৯৩৭ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ ‘প্রাগৈতিহাসিক’। প্রাথমিক গ্রন্থ প্রকাশনায় কথাসাহিত্যিক হিসেবে সাফল্য অর্জনের পর যথাক্রমে প্রকাশিত হয় : ‘অমৃতস্য পুত্রাঃ’ (১৯৩৮), ‘মিহি ও মোটা কাহিনী’ (১৯৩৮), ‘সরীসৃপ’ (১৯৩৯), ‘বৌ’ (১৯৪০), ‘সহরতলী’ (১৯৪০-৪১), ‘অহিংসা’ (১৯৪১), ‘ধরাবাঁধা জীবন’ (১৯৪১), ‘চতুষ্কোণ’ (১৯৪২), ‘সমুদ্রের স্বাদ’ (১৯৪৩) এবং ‘প্রতিবিম্ব’ (১৯৪৩)।
১৯৪৪ সালে মানিক কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করার পর তার কথাসাহিত্য দ্বিতীয় পর্বে প্রবেশ করে। তবে ১৯৪৪ প্রকাশিত ‘ভেজাল’ গল্প সংকলন এবং ১৯৪৫ সালের ‘দর্পণ’ উপন্যাসটি এ পর্যায়ভুক্ত হবে না। দ্বিতীয় পর্বের শুরু ‘সহরবাসের ইতিকথা’ (১৯৪৬) উপন্যাসটি দিয়ে। এসময় মানিক একদিকে সক্রিয় পার্টির কাজে অন্যদিকে বেঁচে থাকার সংগ্রামে অবতীর্ণ। প্রকাশিত হয়েছে একাধিক উপন্যাস ও গল্প গ্রন্থ। ‘চিহ্ন’ (১৯৪৭) এ পর্বের একটি অসাধারণ উপন্যাস। ভারতবর্ষের গণআন্দোলনের সঙ্গে জনজীবনের সম্পৃক্ততা এ উপন্যাসে শৈল্পিক অভিব্যক্তি লাভ করেছে। এ পর্বে আরো প্রকাশিত হয়েছে : ‘আজ কাল পরশুর গল্প’ (১৯৪৬), ‘চিন্তামণি’ (১৯৪৬), ‘পরিস্থিতি’ (১৯৪৬), ‘আদায়ের ইতিহাস’ (১৯৪৭), ‘খতিয়ান’ (১৯৪৭), ‘মাটির মাশুল’ (১৯৪৮), ‘ছোটবড়’ (১৯৪৮), ‘ছোট বকুলপুরের যাত্রী’ (১৯৪৯), ‘জীয়ন্ত’ (১৯৫০), ‘পেশা’ (১৯৫১), ‘স্বাধীনতার স্বাদ’ (১৯৫১), ‘সোনার চেয়ে দামী’ (১৯৫১-৫২), ‘ছন্দপতন’ (১৯৫১), ‘ইতিকথার পরের কথা’ (১৯৫২), ‘পাশাপাশি’ (১৯৫২) ও ‘সার্বজনীন’ (১৯৫২)।
১৯৫২ সালের পর মানিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অর্থাভাব ও অতিরিক্ত পরিশ্রম তার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে। তার লেখা ডায়েরির সাক্ষ্য অনুসারে ১৯৫২ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত তাকে লেখা অব্যাহত রাখতে হয়েছে অ্যালকোহলের ওপর নির্ভর করে। এ সময় প্রকাশিত হয়: ‘নাগপাশ’ (১৯৫৩), ‘আরোগ্য’ (১৯৫২), ‘চালচলন’ (১৯৫৩), ‘তেইশ বছর আগে পরে’ (১৯৫৩), ‘ফেরিওলা’ (১৯৫৩), ‘হরফ’ (১৯৫৪), ‘শুভাশুভ’ (১৯৫৪), ‘লাজুকলতা’ (১৯৫৪), ‘পরাধীন প্রেম’ (১৯৫৫), ‘হলুদ নদী সবুজ বন’ (১৯৫৬), ‘মাশুল’ (১৯৫৬), ‘প্রাণেশ্বরের উপাখ্যান’ (১৯৫৬)। শেষ পর্বের এসব উপন্যাসের শিল্প সার্থকতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একজন সাহিত্যিকের অবিরাম সৃজন প্রচেষ্টার দ্যোতক এসব রচনা। অবশ্য ‘প্রাণেশ্বরের উপাখ্যান’ মরণোত্তর প্রকাশিত উপন্যাস। মরণোত্তর আরো প্রকাশিত হয় ‘মাটি ঘেঁষা মানুষ’ (১৯৫৭), ‘শান্তিলতা’ (১৯৬০) প্রভৃতি উপন্যাস। ‘পেশা’, ‘স্বাধীনতার স্বাদ’, ‘সোনার চেয়ে দামি’, ‘ছন্দপতন’, ‘ইতিকথার পরের কথা’, ‘পাশাপাশি’, ‘সার্বজনীন’, ‘নাগপাশ’, ‘চালচলন’, ‘তেইশ বছর আগে পরে’, ‘শুভাশুভ’ প্রভৃতি উপন্যাসে ও অজস্র ছোটগল্পে দেশভাগ, দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, কৃষক-শ্রমিক-মজুর এবং কালোবাজারির
বাস্তব চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
‘হলুদ নদী সবুজ বন’ উপন্যাসে কৃষক ও মজুর শ্রেণীর চিত্র পাওয়া যায়। এমনকি কলকারখানার শ্রমিকদের কৃষক সত্তার পরিচয় দিয়েছেন মানিক। ‘কারখানার মেশিনে অয়েলের গন্ধ ঘিরে থেকেও মজুরদের বড় একটা অংশের নাক থেকে সোঁদা মাটির গন্ধ মুছে গিয়ে ঢেকে দিতে পারে না।’ ‘মেজাজ’ গল্পে ভৈরব চাষী গরিব অসহায় কিন্তু মেজাজে অত্যাচারী সমাজের বিপক্ষে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। এজন্য মানিক লেখেন, ‘মানুষটা চাষা তাতে গরিব, তার মেজাজ হয় কি-সে?’ ‘প্রাগৈতিহাসিক’, ‘আপদ’, ‘নমুনা’ প্রভৃতি গল্পে দরিদ্রের সমাজ বাস্তবতা রূপায়িত হয়েছে। চাষি-মাঝি-জেলেদের দারিদ্র্যপীড়িত মুখ দেখে কলেজ পড়–য়া মানিকের মনে হতো, ‘ওই মুখগুলোÑ মধ্যবিত্ত আর চাষা ভূষোÑ ওই মুখগুলো আমার মধ্যে মুখর অনুভূতি হয়ে চ্যাঁচাতোÑভাষা দাওÑভাষা দাও।’ (গল্প লেখার গল্প) দরিদ্র মানুষের বঞ্চিত জীবন তাকে অনেক আগে থেকে নাড়া দেয়। তাদের অমার্জিত রিক্ত জীবনের রুক্ষ কঠোর নগ্ন বাস্তবতা অস্থির করে তুলতো তাকে। ফলে বঞ্চিতের পক্ষে, মানবতার পক্ষে তিনি উচ্চকিত হয়ে উঠেছেন। ‘আজ কাল পরশুর গল্প’ সংকলনে মন্বন্তরের পটভূমিতে গরিবের নিঃস্ব চিত্র বীভৎস বাস্তবতায় ফুটে উঠেছে। ‘যাকে ঘুষ দিতে হয়’, ‘দুঃশাসনীয়’ ইত্যাদি গল্প এক্ষেত্রে স্মরণীয়। ‘বৌ’ গল্পগ্রন্থের ‘দোকানির বৌ’, ‘কেরানীর বৌ’, ‘কুষ্ঠরোগীর বৌ’, ‘জুয়ারীর বৌ’ প্রভৃতি গল্পে দারিদ্র্য ও নারীর অস্তিত্ব সংগ্রাম বর্ণিত হয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর ঘর ও বাইরের জগতে যে বঞ্চনা চলে তারও সঙ্কটময় চিত্র এসব গল্পে রূপায়িত হয়েছে।
১৯৩৭ সালে (‘পদ্মা নদীর মাঝি’, ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ ও ‘প্রাগৈতিহাসিক’ প্রকাশিত হয়েছে।) ২৪ সেপ্টেম্বর মানিক তার দাদাকে এক পত্রে ‘জনগণের সাহিত্যিক’ হওয়ার প্রচেষ্টাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে লেখেন : ‘আমার যতোদূর বিশ্বাস, সাহিত্যক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি নাম করিবার জন্য স্বাস্থ্যকে সম্পূর্ণ অবহেলা করাই আমার এই অসুখের কারণ। আমার প্রথম পুস্তক ১৩৪০(১৩৪১) সালে প্রকাশিত হয়। তিন চার বছরের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের অধিকাংশ সমালোচক স্বীকার করিয়াছেন যে, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের পরবর্তী যুগে আমি সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক। অবশ্য সধংং-এর নিকট ঢ়ড়ঢ়ঁষধৎ হইতে আমার কিছুদিন সময় লাগিবে, কারণ সধংং-সরহফ নূতন চিন্তাধারাকে অত্যন্ত ধীরে ধীরে গ্রহণ করে। এই নিয়মে শিক্ষিত শ্রেণী ছাড়া সধংং-এর মধ্যেও আমার ঢ়ড়ঢ়ঁষধৎরঃু যে ক্রমে ক্রমে বাড়িতেছে তাহার পরিচয়ও আমি পাইতেছি। বাংলাদেশে সাহিত্যক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য আমাকে আর কিছু করিতে হইবে না।’
সধংং-এর কাছে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য মানিকের অভিজ্ঞতা সাহিত্য সৃজনে পূর্বাপর সক্রিয় ছিল। টাঙ্গাইল পর্বের (১৯২২-২৪) স্মৃতিচারণে তিনি বলেছেন : ‘…ভদ্রজীবনের সীমা পেরিয়ে ঘনিষ্ঠতা জন্মাচ্ছিল নিচের স্তরের দরিদ্র-জীবনের সঙ্গে। উভয় স্তরের জীবনের অসামঞ্জস্য, উভয়স্তরের জীবন সম্পর্কে নানা জিজ্ঞাসাকে স্পষ্ট ও জোরালো করে তুলতো। ভদ্র জীবনে অনেক বাস্তবতা কৃত্রিমতার আড়ালে ঢাকা থাকে, গরিব অশিক্ষিত খাটুয়ে মানুষের সংস্পর্শে এসে ওই বাস্তবতা উলঙ্গ রূপে দেখতে পেতাম, কৃত্রিমতার আবরণটা আমার কাছে ধরা পড়ে যেতো।…’(সাহিত্য করার আগে)
শিক্ষাজীবনে দুবছর মেদিনীপুর (১৯২৪-২৬) বাসের অভিজ্ঞতা ফলপ্রসূ হয়েছিল তার শিল্প সৃজনে। অন্ত্যজশ্রেণী সম্পর্কে তিনি আরো সচেতন হন। ‘শহরের নোংরা বস্তির অন্ত্যজশ্রেণীর মানুষ, শহরঘেঁষা কাঁসাই নদী, পার্শ্ববর্তী কুঁড়েঘরসর্বস্ব ছোট ছোট  গ্রাম, রেললাইনের ধারে প্রকা- ফাঁকা মাঠ এবং শহর পেরিয়ে একটু এগোলেই বিরাট বিশাল শালবন।’ (অলৌকিক লৌকিকতা/মানিক গ্রন্থাবলী/১২ খ-)
পিতার চাকরি সূত্রে মানিককে ঘুরতে হয়েছে কলকাতা, টাঙ্গাইল, মেদিনীপুর, তমলুক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কাঁতি, শালবনী, নন্দীগ্রাম ও মহিমদল। অর্থাৎ জনজীবনে দারিদ্র্যের উলঙ্গ রূপ দেখেছেন শৈশবের শুরু থেকেই। নিজেদের পারিবারিক জীবনের তিক্ত ঘটনাগুলোও তাকে ভাবিয়েছে। অজস্র দুশ্চিন্তা, অর্থাভাবজনিত দীনতা, অস্বাস্থ্য, অপুষ্টির পরিণামে করুণ অবস্থা, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব, পরিচিতদের স্বভাবের নীচতা হিংস্রতার ক্রমবর্ধমান বিস্তার তাকে উদ্বেল আকুল করেছে শেষ জীবনে। মূলত মানিকের সাহিত্যের অধিকাংশ মানুষই গরিব, দারিদ্র্যসীমার প্রান্তে বসবাসকারী জনগোষ্ঠী তারা। সমাজের শোষিত বঞ্চিত অবহেলিত অন্ত্যজ অস্পৃশ্য অজ্ঞ অশিক্ষিত কুসংস্কারাছন্ন মানুষ নিবিড় মমতায়, ভালোবাসা ও বিশ্বাসের গভীরতায় ভিড় করে এসেছে তার কথাসাহিত্যে। দরিদ্রের সমব্যথী মানিক মাটি ও মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় লিখেছেন একাধিক উপন্যাস ও ছোটগল্প। গণসচেতন ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ গ্রহণের আগেই। এজন্য ১৯৩৬ সালে প্রকাশিত ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসে মাছমারা জেলেদের অপরিচিত জীবন-যাপনকথা আশ্রয় করেছে কুবেরের কাহিনীতে। নিম্নশ্রেণীর নিপীড়িত মানুষের সত্য জীবনালেখ্য  কুবের-কপিলা-মালা, রাসু, গণেশ, পীতম, ধনঞ্জয়, সিধু, যুগী, উলুপী প্রভৃতি চরিত্রের প্রতিনিধিত্বে প্রকাশ পেয়েছে। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন : ‘ইহার সম্পূর্ণরূপে নিম্নশ্রেণী অধ্যুষিত গ্রাম্যজীবনের চিত্রাঙ্কনে সূক্ষ্ম ও নিখুঁত পরিমিতিবোধ, ইহার সঙ্কীর্ণ পরিধির মধ্যে সনাতন মানব প্রবৃত্তিগুলোর ক্ষুদ্র সংঘাত ও মৃদু উচ্ছ্বাসের যথাযথ সীমানির্দেশ।’ অভিনব বিষয়বস্তু, বাস্তবতা, কথ্যভাষার সফল ব্যবহার, চরিত্রচিত্রণে দক্ষতা, সূক্ষ্ম সাংকেতিকতা ও রহস্যময়তা এ উপন্যাসের জনপ্রিয়তার কারণ। এছাড়া ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’, ‘অমৃতস্য পুত্রাঃ’, ‘মিহি ও মোটা কাহিনী’, ‘সরীসৃপ’,  ‘সহরতলী’, ‘আজ কাল পরশুর গল্প’, ‘আদায়ের ইতিহাস’, ‘খতিয়ান’, ‘দর্পণ’, ‘মাটির মাশুল’, ‘হলুদ নদী সবুজ বন’ প্রভৃতি উপন্যাস ও গল্পে দরিদ্র আমজনতারই  দীপ্ত পদচারণা। এসব রচনায় যুগ যুগ ধরে বঞ্চিত, অবহেলিত, দারিদ্র্যপীড়িত নিম্নবর্গের মানুষের জীবন চিত্রিত হয়েছে। একইসঙ্গে বঞ্চনা, অবহেলা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানিকের কণ্ঠস্বর প্রতিবাদী হয়ে উঠেছে।
কুলিমজুরের পক্ষে ‘সহরতলী’ উপন্যাসে যশোদার দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে শুনি : ‘ভদ্রলোকেরা নাকি বড় বেশি ছোটলোক, যারা পুরা ভদ্রলোক নয়, খাঁটি ছোটলোকও নয়, তারা নাকি, একটা অদ্ভুত অপদার্থ জীব। তার চেয়ে কুলিমজুরও ভালো। বাবুদের চক্ষুলজ্জা আছে, কুলিমজুরের ভয়ডর আছে, কিন্তু  না-বাবু না- কুলিমজুরদের চক্ষুলজ্জাও নাই, ভয়ডরও নাই।’ এই উপন্যাসে শ্রমিকদের কথা, তাদের ব্যক্তি-জীবনকথা, নানাভাবে বলা হয়েছে। মূলত শ্রমিক জীবন, শ্রমিক মালিক সম্পর্ক এবং বিশেষ করে সত্যপ্রিয় ও যশোদার মতো চরিত্র সৃষ্টিতে মানিকের দক্ষতা প্রকাশ পেয়েছে। নিজের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করেছেন মানিক :
‘নিজেকে সাধারণ মানুষ ভাবা ছাড়াও আমার পথ নেই। জনসাধারণ সাধারণ আর আমি অসাধারণ, কারণ আমি লেখক, এ ধারণা নিয়ে ভালোবাসতে গেলে মানুষ কাছে ঘেঁষতে দেবে না, মানব প্রেমে বুক ফেটে যাওয়া বেদনার সৃষ্টিও গ্রহণ করবে না। এমন অভিজ্ঞান যার অর্জিত, তার পক্ষে একজন কুবের বা হোসেন মিয়া বা রাসু বা আমিনুদ্দি হয়ে উঠতে অসুবিধা হয় না।’
অন্যত্র তিনি বলেছেন : ‘আমি শ্রমিক হতে অনিচ্ছুক, এ নির্লজ্জ ঘোষণা তো আমার লেখায় কোথাও নেই।’
‘অহিংসা’ উপন্যাসে গরিবের প্রতি মানিকের মমত্ববোধের পরিচয় পাওয়া যায়। এই উপন্যাসে ‘যাত্রা’ দেখার সূত্রে লেখক দেখিয়েছেন যাত্রার আসরে জায়গা থাকা সত্ত্বেও গ্রামের ভদ্রলোকেরা গরিবদের শতরঞ্জিতে বসতে দেয় না। কারণ গরিবরা ‘যাত্রা শুনতে যায় গামছা কাঁধে’ করে। অন্যদিকে ‘শহরবাসের ইতিকথা’য় আমরা দেখতে পাই গ্রামের শ্রীপতি কামার শহরে এসে কারখানায় চাকরি নিয়েছে। কিন্তু তার মন পড়ে আছে গ্রামের বাড়িতে তার স্ত্রীর কাছে। শ্রীপতি শ্রমিকদের একজন হওয়ার পরে শ্রমিকদের দাবি আদায়ের গল্প শোনে। নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়। এভাবে মানিকের উপন্যাসে গ্রামের অশিক্ষিত দরিদ্র কামার শহরের শ্রমিক হয়ে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সংগ্রামী হয়ে উঠেছে। ‘চিন্তামণি’ উপন্যাসে গ্রাম বাংলার ছবি আছে। আছে রাইস মিলের মজুরদের চিত্র। তবে রাইস মিলের মালিক নীলকণ্ঠ বাবুর বাড়ির ঝি চিন্তামণির কাহিনী এ উপন্যাসে প্রাধান্য পেয়েছে। মানিক বলেছেন ‘বঞ্চিত নিষ্পেষিত জীবন এদের কাছে স্বাভাবিক সঙ্গত ও অভ্যস্ত হয়ে এসেছে …।’ অর্থাৎ এই বঞ্চিত মানুষের করুণ অভিব্যক্তি সহানুভূতির সঙ্গে তুলে ধরেছেন লেখক। গ্রাম ভাঙা অসহায় মানুষের কল-কারখানায় মজুরগিরি করার ইতিহাস আসলে দরিদ্রের ইতিহাস হিসেবেই তাৎপর্যবহ। ‘জীয়ন্তে’ চামড়া কারখানার মুচিদের প্রসঙ্গ এসেছে বিপ্লবী আন্দোলনের পটভূমিকায়। দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা, গণআন্দোলন প্রভৃতির অনুষঙ্গে  ‘স্বাধীনতার স্বাদ’ উপন্যাসে দরিদ্রের জীবন রূপায়িত হয়েছে। দাঙ্গা প্রতিরোধে শান্তি কমিটির নাজিম বলেছে, ‘এই দাঙ্গার পেছনে, ধর্মের নামে এই খুনোখুনির পেছনে কি কারসাজি আছে, কাদের কারসাজি আছে, এখনো না সমঝালে গরিব মানুষকে Ñ খাটুয়ে মানুষকে হাড়ে হাড়ে টের পেতে হবে।’ ‘সোনার চেয়ে দামী’ উপন্যাসের প্রথম খ-ে রাখালের বেকার জীবনের অনুভাবনায় আছে দারিদ্র্যের প্রসঙ্গ : ‘দারিদ্র্য, রসকস শুষে নেয় জীবনের, জ্বালা আর অশান্তি রুক্ষতা এনে দেয় মাধুর্য কোমলতার আবরণ ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে।’ দারিদ্র্যের চাপে মানুষের জীবন ও জীবিকাকে লেখক নিরীক্ষা করেছেন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে।
বস্তুত দরিদ্র মানুষের জীবনকে দরদের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন মানিক। কিন্তু তার নিজের জীবনের অসহনীয় দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও মানসিক নিপীড়নের কাহিনী থেকে বিচলিত এক মানিককে আমরা আবিষ্কার করি। ১৯৪৯ সালে পিতৃগৃহ বিক্রির পর ভাইদের সঙ্গে যৌথ পরিবারের আশ্রয় ছেড়ে বৃদ্ধ পিতাসহ ভাড়াবাড়িতে ওঠার পর মানিকের জীবনে দারিদ্র্যের সূচনা হয়। মারাত্মক আর্থিক সঙ্কট, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার অন্ধকারে প্রবেশ করেন তিনি। নিজের রোগের প্রকোপ বৃদ্ধিতে এবং বিরূপ রাজনীতিক বিতর্কে নিজের সহযাত্রীর কাছ থেকে আক্রমণের শিকার হয়ে তিনি আরো বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে এখানে উল্লেখ্য যে প্রথম জীবনে মানিক সাহিত্য সাধনায় খ্যাতি লাভের সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্য ও দুঃসহ ব্যাধি অর্জন করেন। কিন্তু ১৯৩৮-৪৮ কালপর্বে পরিস্থিতি ১৯৪৯-এর পরবর্তী বছরগুলোর মতো ছিল না। কলকাতায় ৪ ভাইয়ের বাড়ি থাকা সত্ত্বেও বাড়ি বিক্রির এক বছরের মাথায় ছয়জনের সংসারে নিজের পিতাকে ঠাঁই দেন তিনি। ১৯৫০ সালে পঞ্চমবারের মতো গর্ভবতী হয়ে মৃত সন্তান প্রসব করলে দারিদ্র্যের কারণে তার স্ত্রী স্বস্তিবোধ করেন। ১৯৫২ সালে আর্থিক সঙ্কট আরো মারাত্মক হয়ে ওঠে। সুদের বিনিময়ে স্ত্রীর অলঙ্কার বন্ধক রেখে ঋণ করেন তিনি। ১৯৫৩-৫৬ তিন বছরের জীবন ছিল দুর্বিষহ। নিজের অসুস্থতা, পুত্র-কন্যার অসুস্থতা, পাওনাদার ও দোকান মালিকদের খারাপ আচরণ এবং বাকি ভাড়ার জন্য বাড়িওয়ালার উকিলনোটিশ নিয়ে বিব্রত মানিককে অতি মাত্রায় পানাসক্ত করে তোলে। ১৯৫৫ সালে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনমাস ছিলেন। হাসপাতাল ত্যাগের পর জ্যেষ্ঠকন্যার ভাঙা পায়ের চিকিৎসা ও বাড়িওয়ালার মামলায় বিচলিত হতে হয়েছে তাকে। এ সম্পর্কে অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় ‘কালের প্রতিমা’ গ্রন্থে লিখেছেন : ‘উদয়াস্ত খাটুনি, অর্থাভাব, আরো খাটুনি, তা থেকে মুক্তির জন্য সুরাসক্তি, অসুস্থতা, আরো খাটুনি এই অন্ধ বৃত্তের মধ্যে পাক খেয়ে চলতে থাকে তার জীবন। দারিদ্র্য থেকে মুক্তির জন্য অনবরত লেখা, উদ্বেগ থেকে মুক্তির জন্য সুরাসক্তি : এই অন্ধ চক্রাবর্তনে মানিক খুব দ্রুত আত্মক্ষয় করছিলেন। শেষ পর্যন্ত যকৃতের রোগ, রক্ত আমাশা ও মৃগীরোগ একসঙ্গে আক্রমণ করে এই প্রতিভাবান লেখককে ভূপাতিত করলো।’ ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর মানিক পরলোকগত হন। ৩১ জুলাই ডায়েরিতে তাকে লেখতে দেখা যাচ্ছে: ‘কদিন থেকে শরীর খুব খারাপ… কী যে দুর্ব্বল বলা যায় নাÑ বিছানা থেকে উঠবারও যে শক্তি নেইÑ এদিকে ঘরে পয়সা নেইÑ জোর করে তো বেরোলাম ফিরব কি না না জেনে।’ ‘এদিকে ঘরে পয়সা নেই’ এই বাস্তবতা মানিকের নিজের সৃষ্টি অনেক চরিত্রের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে পড়া যায়।
এই হলো মানিকের দারিদ্র্যের ইতিহাস। তিনি ছিলেন দরিদ্রের মুখপাত্র অথচ কি ভয়ঙ্কর ছিল তার দারিদ্র্য লাঞ্ছিত জীবন। মধ্যবিত্ত মানিক দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করে আত্মসম্মান বজায় রেখে তা থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত পরাজিত হয়েছেন। এদেশে দারিদ্র্য মুক্তির জন্য ২০১৫ সালকে টার্গেট ধরা হয়েছে। এই টার্গেট পূর্ণ করার জন্য মানিকের জীবন থেকে শিক্ষা নেয়া যেতে পারে। মধ্যবিত্তের আর্থিক সঙ্কট নিরসনে তথা দারিদ্র্যমোচনে মানিকের কষ্টের জীবন উত্তরণের পথ দেখাতে পারে; তার জন্মশতবর্ষে এই প্রত্যাশা আমাদের।

http://www.munshigonj.com/Special/Manik100/Manik100.htm

No comments yet

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s

Follow

Get every new post delivered to your Inbox.