ওয়েবসাইট হ্যাকিং, সাইবার আইনের যথাযথ প্রয়োগ চাই
ড. জুলফিকার আহম্মদ
ওয়েবসাইট হ্যাকিং, সাইবার পর্নোগ্রাফি, ই-মেইল থ্রেট ইত্যাদি অপরাধের কথা অনেকবার শুনেছে তথ্য, যোগাযোগ ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নতুন সদস্য এ দেশটির জনগণ। তবে এখন নতুন খবর হলো, ওয়েবসাইট হ্যাকিং, সাইবার পর্নোগ্রাফি, ই-মেইল থ্রেট ইত্যাদি অপরাধের অপরাধীরা আর ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে না। কেননা, ৫ সেপ্টেম্বর র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন−র্যাবের ওয়েবসাইট হ্যাক করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে র্যাব হ্যাকারদের গ্রেপ্তার করেছে। গত শনিবার রাতে মিরপুরের একটি বাসা থেকে চারজন হ্যাকারকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। গ্রেপ্তারকৃতরা মিরপুরে সাইক ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট টেকনোলজি কলেজের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের চতুর্থ সেমিস্টারের ছাত্র। এরা হলো: শাহী মির্জা (২১), সৈয়দ ইসতিয়াক (২১), জায়েদুল হোসেন (২১) ও তাওহিদুল ইসলাম (২১)।
শাহী মির্জার উদ্দেশ্য ছিল তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার জন্য সরকার বা প্রশাসনকে সতর্ক করা। সেটা বোঝা যায় তার গত ১৮টি সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ওয়েবসাইট হ্যাকিং করার প্রবণতা দ্বারা। সে বা তার বন্ধুরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য এ ধরনের অপরাধ করেনি। হ্যাকিংয়ের তালিকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওয়েবসাইট, সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের ওয়েবসাইট ও অনলাইন বিডিনিউজের ওয়েবসাইট রয়েছে। তবে শাহী মির্জার জানা ছিল না, এটা কত বড় একটি অপরাধ। এ অপরাধ সংঘটনের জন্য শাহী মির্জাকে ২০০৬ সালের আইনানুযায়ী বড় ধরনের শাস্তি পেতে হবে এবং তার পরিবারকে গুনতে হবে অনেক ক্ষতিপূরণ।
বাংলাদেশে তথ্য, যোগাযোগ ও প্রযুক্তি আইন বা সাইবার আইন পাস হওয়ার আগেও এ ধরনের অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। তবে সে ক্ষেত্রে আমাদের পুলিশ ও প্রশাসন নীরব ভুমিকা পালন করেছে। ২০০০ সালে যখন এক মহিলার নগ্ন ছবি ইন্টারনেটে ছাড়া হয়, তখন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও কোনো সিদ্ধান্ত পৌঁছাতে পারেননি এটা কোন আইনানুয়ায়ী মামলা করা যাবে। এ ছাড়া আরও অনেক ধরনের সাইবার ক্রাইম বাংলাদেশে হয়েছে, যে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পুলিশ ও প্রশাসনকে নীরব ভুমিকা পালন করতে হয়েছে যথাযথ আইনের অভাবে।
তবে এবার এ অপরাধীদের বিরুদ্ধে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর ৫৫/৫৬ ধারায় মামলা করার সুযোগ রয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর ৫৫ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে কোনো কম্পিউটার, কম্পিউটার প্রোগ্রাম, সিস্টেম বা কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যবহূত কম্পিউটার সোর্স কোড, গোপন ধ্বংস বা পরিবর্তন করলে বা অন্য কোনো কাজের মাধ্যমে কোড, প্রোগ্রাম, সিস্টেম বা নেটওয়ার্ক গোপন, ধ্বংস বা পরিবর্তন করার চেষ্টা করলে এবং সোর্স কোডটি যদি আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইন দ্বারা সংরক্ষণ বা রক্ষণাবেক্ষণ হয় তাহলে এ কাজ একটি অপরাধ। এ অপরাধের জন্য অনধিক তিন বছর কারাদন্ড বা অনধিক তিন লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। যেহেতু শাহী মির্জা র্যাবের ওয়েবসাইটের সোর্স কোড ধ্বংস করেছে, আর এ ধরনের ব্যাখ্যানুযায়ী ওয়েবসাইটে সোর্স কোড তালিকাভুক্ত প্রোগ্রাম, কম্পিউটার কমান্ড, ডিজাইন তালিকাভুক্তি এবং কম্পিউটারভিত্তিক যেকোনো ধরনের প্রোগ্রাম বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত, যেহেতু এ ধারানুযায়ী তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৬ ধারায় হ্যাকিংয়ের সংজ্ঞা পরিষ্ককারভাবে বলা হয়েছে এবং হ্যাকিংয়ের অপরাধের জন্য অনধিক ১০ বছর কারাদন্ড বা অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবে। এ ধারাগুলোর আওতায় বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মামলা করে র্যাব।
তবে এ আইনের অধীন প্রথম অপরাধীকে মামলার কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর আগে আইনগত দিকগুলো পর্যালোচনা করে দেখা দরকার। নইলে প্রথম থেকেই যদি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ত্রুটি থেকে যায় তাহলে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির সাধারণ সুবিধাভোগীরা এসব সাইবার অপরাধীদের তথা হ্যাকারদের কবল থেকে রেহাই পাবে না।
বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি তা থমকে যেতে পারে যদি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন, ২০০৬-কে সময়োপযোগী ও বাস্তব উপযোগী করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়। এসব খুদে সাইবার ক্রিমিনালসহ অন্য কম্পিউটার বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সাইবার আইনি সচেতনতা সৃষ্টি করা, যাতে তারা জানতে পারে যে কোনটি অপরাধ আর কোনটি কৃতিত্বপূর্ণ কাজ। ২০০৫ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত প্রথম আইসিটি সেমিনারের আয়োজন করে কুয়েট। অনেক বাঘা বাঘা আইসিটি ও টেলিকমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি আমাকে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে বলেন আমার পরম শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. আবদুস সোবহান স্যার। সেমিনারের দিন গবেষক হিসেবে আমার ‘বাংলাদেশে সাইবার আইনের প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক প্রবন্ধটি উপস্থাপন করতে শুরু করলাম। প্রশ্নোত্তর পর্বে গিয়ে শুরু হলো বারবার একই প্রশ্ন, আমরা আইসিটি ও টেলিকমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞরা এ আইন দিয়ে কী করব? তখন আমি তাদের একটি কথা বলেছিলাম, যে ব্যক্তি বন্দুক বা পিস্তল তৈরি করে সে কিন্তু সেটি মাত্র তৈরি করেই ক্ষান্ত। তাই এটা তাঁর জন্য অপরাধ নয়। কিন্তু আপনারা যাঁরা আইসিটি ও টেলিকমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ, তাঁরা এটা শুধু তৈরির সঙ্গে জড়িত থাকেন না; বরং এটিকে কার্যোপযোগী করে তোলেন। সেহেতু কোনটি ভালো ও কোনটি অন্যায় তা জানা দরকার। আজকে যদি শাহী মির্জা বা তার বন্ধুরা এ সেমিনারে থাকত তাহলে হয়তো তারা এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ত না। সুতরাং সচেতনতা সৃষ্টি করা, যাতে সচেতনতার অভাবে আইসিটি ও টেলিকমিউনিকেশনের খুদে বিশেষজ্ঞরা নিজেদের মেধার অপপ্রয়োগ না করেন।
লেখক: সাইবার আইন গবেষক ও সহকারী অধ্যাপক, আইন ও বিচার বিভাগ, রাবি।